বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের ২০২২-২০২৩ সেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদের ষান্মাসিক অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাব সমূহ-
(পর্ব-২: প্রস্তাব- ৪, ৫ ও ৬)
প্রস্তাব-৪ : দেশে দেশে মুসলিম নির্যাতন প্রসঙ্গে
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের ২০২২-২০২৩ সেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদের ষান্মাসিক অধিবেশন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, আজ নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে হয়ে বিশ্ব মুসলিম সর্বত্র নিষ্পেষিত। পদে পদে লাঞ্ছিত ও অপমানিত। জোটবদ্ধ কুফরী শক্তি ইসলাম ও মুসলিম নিধনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পৃথিবীর বুকে ইসলাম নামের বৃক্ষটি তার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে জীবন্ত থাকাকে আদৌ তারা মেনে নিতে পারে না। তাই প্রতিনিয়ত ইসলামকে অকার্যকর ও মুসলিম জাতিকে শাষরুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ হীনস্বার্থ হাসিলের তরে এঁকে চলছে কুটিল ষড়যন্ত্রের নীল নকশা। বিগত কয়েক শতক ধরে বিশ্ব ভূখণ্ডে মুসলমানদের উপর নির্যাতন-নিষ্পেষণ চলছে। সাম্প্রতিককালে এসব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসরাইল গত বছর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ৯৫৩টি ফিলিস্তিনের কাঠামো ভেঙে দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপ মহাদেশের অধিকাংশ দেশ নিয়ে গঠিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউ জানিয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে রেকর্ড করা জরিপে এটি সর্বোচ্চ ধ্বংসের ঘটনা। শুধুমাত্র পশ্চিম তীরের এরিয়া, সি এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৩১ ফিলিস্তিনিকে স্থানচ্যুত করা হয়েছে।
মিয়ানমারে মুসলিম নিধন চলছে অনেক দিন যাবত। প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ মুসলমান বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই নির্যাতন-নিষ্পেশন এখনও চলছে সেখানে। বরং দিন দিন বাড়েছে। মিয়ানমার সরকরের কড়াকডির কারণে মিয়ানমারের প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হয় না। তবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের মর্টার শেল এসে পড়ার ঘটনা থেকে ধারণা করা যায়, কতটুকু নির্যাতনের শিকার আজ মিয়ানমারের মুসলিমরা।
এছাড়াচীনের উইঘুরে মুসলিম নির্যাতন চলছে দীর্ঘ সময় ধরে। অ্যামনেস্টি ইন্টারনাশনাল কর্তৃক জাতিসংঘে দাখিল করা প্রতিবেদন মতে, ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ সংশোধন’ সেন্টারগুলোতে আটক রাখা হয়েছে। আর ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও দীক্ষাদান কেন্দ্রে’ থাকতে ও ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। নিজ দেশেই পরাধীনের মতো জীবন চলছে তাদের। গত কিছুদিন আগে ফজরের পর ইসরায়েলি পুলিশ অভিযানের নামে চালিয়েছে নির্যাতন। এতে আহত হয়েছে পায় দেড় শতাধিক।
এদিকে কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের নির্যাতন মুসলমানদের উপর দিন দিন বেড়েই চলছে। কর্নাটকে হিজাব পরিধান নিয়ে মুসলমান নারীদের উপর চড়াও হওয়া, মুসলিম পরিবারের উপর শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে নির্যাতন ইতাদি কাছাকাছি সময়ের নিয়মিত চিত্র।
বাংলাদেশ ইসলমী ছাত্র মজলিসের কেদ্ৰীয় প্রতিনিধি পরিষদের চলমান অধিবেশন বৈশ্বিকভাবে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মুসলিম নেতাদের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জোর দাবি জানাচ্ছে।
প্রস্তাব-৫ : মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা প্রসঙ্গে
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের ২০২২-২০২৩ সেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদের ষান্মাসিক অধিবেশন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, রমজানের পবিত্রতা রক্ষা যেভাবে যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করা ঈমানের দাবী, বাস্তবে তার সামান্যও রক্ষা করা হচ্ছে না। আমরা জানি রমজানুল মোবারক বান্দার জন্য আল্লাহ তা’য়ালার অনেক বড় নেয়ামত। এই মাসের দিবস রজনীকে আল্লাহ তা’য়ালা খায়ের ও বারাকাহ দ্বারা পূর্ণ করে রেখেছেন। এটা এবাদতের মাস। সকল মুমীনদের উচিৎ এ মাসকে যথাযথ সম্মানের সাথে পালন করা। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা। সকল ধরণের হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা।
কিন্তু আমাদের সমাজে এর ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ইবাদত বন্দেগী রেখে ব্যাবসায়ীরা বিক্রিত পণ্যের চড়া মূল্য হাঁকে, ক্রেতারা শুধু ক্রয় নয় বরং মার্কেট পরিদর্শনে ব্যস্ত। না ফরজ নামাজের গুরুত্ব, না তারাবির জামাতে উপস্থিতি, না নফল ইবাদতের প্রতি মনোযোগ। তিলাওয়াত, তাসবীহ, দোয়া ও রোনাজারির প্রশ্নই অবান্তর। এছাড়াও রয়েছে ফ্রি মিক্সিং ইফতারী, টিভি চ্যানেলগুলোতে অশ্লীলতা প্রদর্শনী, প্রকাশ্যে দিনের বেলা হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা, প্রকাশ্যে ধুমপান, নোংরামি, বেহায়াপনা, ধোকাবাজি, মিথ্যাচার, প্রতারণা, মদ, জুয়াসহ সকল ধরনের হারাম কাজের আয়োজন।
কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদ জোর দাবী করছে যে, এহেন পরিস্থিতিতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় এগিয়ে আসুন। রমজানের পবিত্রতা ক্ষুন্ন হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন এবং যথাযথ সম্মানের সাথে রমজানের সিয়াম-ক্বিয়াম আদায় করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
প্রস্তাব-৬ : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ প্রসঙ্গে
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের ২০২২-২০২৩ সেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদের ষান্মাসিক অধিবেশন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি আজ এদেশের মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে অপরিমেয় কষ্টের মধ্যে নিমজ্জিত করেছে। পত্রিকার পাতা খুললেই আজকাল সবার আগে চোখে পড়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির খবর। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। द्रव्यমূল্যের এই উর্ধ্বগতির ফলে নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তের পাশাপাশি আজকাল মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও তিন বেলার খাবার জোগাড় করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি জাতীয় পত্রিকায় ২০২২ সালের রমজান থেকে ২০২৩ সালের রমজান পর্যন্ত ১ বছরের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির তুলনামূলক হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেখা যায় ২০২২ এর রমজানে ভোজ্য তেলের দাম ১৫৪ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১৯০ টাকা, ৭০ টাকার ছোলা এখন ৯৫ টাকা, ১৫০ টাকার ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা দরে। গরুর মাংসের দাম কেজি প্রতি ১৫০ টাকা বেড়ে ৬৫০ টাকার গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে 8০০ টাকা, ৮০ টাকা কেজি দরের চিনি ১২০ টাকা, ১১৫ টাকা কেজির ডাল ১৩৫ টাকা এবং ৩৫ টাকা কেজি দরের আটা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রকারভেদে ৪০-১০০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যার নেপথ্যে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট চক্র ও সরকারের তদারকির অভাব। খামখেয়ালি এবং বিশেষ ব্যবসায়ী শ্রেণীকে বাড়তি সুবিধা প্রদানের দায় সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারেনা। লাগামহীন উর্ধ্বগতির বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযান লক্ষ্য করা গেলেও প্রকৃতপক্ষে এর কার্যকারিতা একেবারেই কম। এমতাবস্থায় দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচানো এবং জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ-মূহূর্তে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধ সময়ের অপরিহার্য দাবিতে রূপান্তর হয়েছে।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের চলমান অধিবেশন মনে করছে যে,
১. দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের উপর জরিমানার পাশাপাশি সশ্রম কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
২. বছরে দুএকবার বাজার নিয়ন্ত্রণ অভিযানের পরিবর্তে বছরব্যাপী বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পালন করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
৩. নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যাতে বিশেষ সুবিধা নিতে না পারে সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে।
তবেই দেশের সাধারণ মানুষের খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার টানাপোড়েন কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদের ষান্মাসিক অধিবেশন সরকারের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জোর দাবি জানাচ্ছে।
উল্লেখে যে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের ২০২২-২০২৩ সেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদের ষান্মাসিক অধিবেশন সংগঠনের মুহতারাম কেন্দ্রীয় সভাপতি বিলাল আহমদ চৌধুরী’র সভাপতিত্বে বিগত ৩০শে মার্চ (বৃহস্পতিবার) সকাল ১১:০০ ঘটিকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শুরু হয়।
অধিবেশনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন সংগঠনের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি এডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, অধ্যাপক আব্দুল জলিল, প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ খসরু, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ও ক্যাম্পাস সম্পাদক কে এম জে আজাদ প্রমুখ।